নামাযের সঠিক পদ্ধতি
সালাত
সালাত এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে দোয়া,রহমত,ক্ষমা প্রাথর্না করা ইত্যাদি। পারিভাষিক অর্থ হচ্ছে, ‘ শরীয়তের নির্দেশিত নিয়মে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার পদ্ধতির নাম “সালাত”।সালাত ‘তকবীরে তাহরীমা’ দিয়ে শুরু হয় আর ‘সালাম’ দিয়ে শেষ হয়।
ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী দৈনিক ৫ বার সালাত আদায় করতে হয়।ফজর, যোহর,আসর,মাগরিব,এশা।
সালাতের গুরুত্ব
- মু’মিন ও অমুসলিমের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে ‘সালাত’।
- কোন মানুষ কলেমা পাঠ করার পরই,প্রথম কাজ হচ্ছে ‘সালাত’ আদায় করা।
- প্রতিদিন ৫ বার ‘সালাত’ পালনের নির্দেশ আছে,যেটা অন্য কোন ইবাদতে নাই।
- মাত্র ৭ বছর বয়স হলেই এটা শুরু করতে হয়্।
- পৃথিবীতে থেকে ‘সালাত’ উঠে যাবার পরই কিয়ামত হবে।
- কিয়ামতের দিন প্রথম হিসাব নেয়া হবে, ‘সালাতে’র।
- সালাত ছাড়া ইসলাম টিকে থাকতে পারেনা।
সালাতের নিয়ম , সময় ও রাকাত
ফযরের সালাত
সূর্য উঠার আগে ২ রাকাত সুন্নত ও ২ রাকাত ফরয।
যোহরের সালাত
দুপুরে ৪ রাকাত সুন্নত,৪ রাকাত ফরয, ২ রাকাত নফল।
আসরের সালাত
বিকালে ৪ রাকাত সুন্নত ও ৪ রাকাত ফরয।
মাগরেবের সালাত
৩ রাকাত ফরয ও ২ রাকাত সুন্নত।
এশার সালাত
৪ রাকাত ফরয, ২ রাকাত সুন্নত ও ৩ রাকাত বিতর।
সমস্ত ওয়াক্তের জন্য সাধারন নিয়ম
১. ওযূ করার পর ছালাতের সংকল্প করে ক্বিবলামুখী হতে হবে।
২. ‘আল্লহু আকবর’ বলে দু’হাত কাঁধ বা কানের লতি বরাবর উঠিয়ে বাম হাতের উপর ডান হাত ধরতে হবে।
৩. সালাতের প্রায় পুরোটা সময় সিজদার স্থানে দৃষ্টি রাখতে হবে।
৪. হাত বুকে বাধা, নাভীতে বাধা, নাভির উপরে বাধা – সবই হাদীসে আছে।
৫. সানা পড়তে হবে। আমাদের মাঝে প্রচলিত:
{ সুব’হানাকা আল্লহুম্মা ওয়া বি’হাম্–দিকা ওয়া তাবা–র–কাস্–মুকা ওয়া তা’আলা জ্বাদ্দুকা ওয়া লা~~ ইলাহা গ্বইরুক }
অর্থ: হে আল্লহ্, তুমি পাক ও পবিত্র! তুমিই প্রশংসার উপযুক্ত, তুমি বরকত দানকারী এবং মহান, তোমার নাম ও মর্যাদা বহু উচ্চে। তুমি ছাড়া আর কোন ইলাহ্ নেই।
৬. আ‘ঊযুবিল্লাহ পাঠ করতে হবে। প্রতি রাকাতে বিসমিল্লাহ–সহ সূরা ফাতিহা পড়তে হবে। এরপর বিসমিল্লাহ-সহ (প্রথম দুই রাকাতে) অন্য কোন সূরা পড়তে করবে। ধীরস্থিরতা বজায় রাখতে হবে।
৭. ‘আল্লহু আকবর’ বলে রুকু করতে হবে। রুকুতে পিঠ সম্পূর্ণ সোজা রাখার চেষ্টা করতে হবে। রুকূর দুআ (প্রচলিত): الْعَظِيْمِ رَبِّيَسُبْحَانَ {সুব’হানা রব্বীয়াল ‘আযীম} (মহাপবিত্র আমার প্রতিপালক যিনি মহান) কমপক্ষে তিনবার পড়তে হবে।
৮. রুকূ থেকে উঠে সোজা ও সুস্থিরভাবে দাঁড়াবেন। দুআ: حَمِدَهُ لِمَنْ اللهُ سَمِعَ { সামি‘আল্লহু লিমান্ ‘হামিদাহ্ } (আল্লাহ শোনেন তার কথা, যে তাঁর প্রশংসা করে)। অতঃপর বলবেন:
الْحَمْدُ لَكَ رَبَّنَا { রব্বানা লাকাল্ ‘হামদ্ } (হে আল্লাহ, হে আমাদের প্রভু! আপনার জন্যই যাবতীয় প্রশংসা)।
৯. ‘আল্লহু আকবর’ বলে সিজদা করতে হবে। সিজদায় যাতে হাত মাটিতে বিছিয়ে দেয়া না হয়। সিজদার দুআ (প্রচলিত): الْأَعْلَى رَبِّيَسُبْحَانَ {সুব’হানা রব্বীয়াল ‘আলা} (মহাপবিত্র আমার প্রতিপালক যিনি সর্বোচ্চ) কমপক্ষে তিনবার পড়তে হবে।
১০. প্রথম সিজদার পর কিছুক্ষণ বসতে হয় দ্বিতীয় সিজদার আগে। এসময় যিকর: কমপক্ষে ২ বার { রব্বিগ্–ফির্–লী } (হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা কর)। এরপর দ্বিতীয় সিজদা করতে হবে।
১১. সালাত এক রাকাতের হলে দ্বিতীয় সিজদার পরই আত্তা’হিয়্যাতু ও দরূদে ইবরহীম পড়তে হবে। দু’আ মাসূরা ও অন্য দু’আও পড়তে পারেন। সালাত দুই রাকাতের হলে দ্বিতীয় রাকাতের শেষে এগুলো পড়বেন। তিন রাকাতের হলে দ্বিতীয় রাকাতের শেষে আত্তা’হিয়্যাতু পড়ে আবার দাড়িয়ে সূরা পাঠসহ ওই রাকাতের বাকি কাজগুলো করে শেষের দিকে বসে আত্তা’হিয়্যাতু-সহ বাকিগুলো পড়বেন। একইভাবে, সালাত চার রাকাতের হলে দ্বিতীয় রাকাতের শেষে আত্তা’হিয়্যাতু পড়ে আবার দাড়িয়ে বাকি দুই রাকাত পড়ে চতুর্থ রাকাতের শেষে আত্তা’হিয়্যাতু-সহ বাকিগুলো পড়বেন।
১২. আত্তা’হিয়্যাতু: আত্তাহিইয়া–তু লিল্লা–হি ওয়াছ্ ছালাওয়া–তু ওয়াত্ ত্বাইয়িবা–তু আসসালা–মু ‘আলায়কা আইয়ুহান নাবিইয়ু ওয়া রহমাতুল্লা–হি ওয়া বারাকা–তুহু। আসসালা–মু ‘আলায়না ওয়া ‘আলা ‘ইবা–দিল্লা–হিছ ছা–লেহীন। আশহাদু আল লা–ইলা–হা ইল্লাল্লা–হু ওয়া আশহাদু আনণা মুহাম্মাদান ‘আব্দুহূ ওয়া রাসূলুহু ।
অর্থ: যাবতীয় সম্মান, যাবতীয় উপাসনা ও যাবতীয় পবিত্র বিষয় আল্লাহর জন্য। হে নবী! আপনার উপরে শান্তি বর্ষিত হৌক এবং আল্লাহর অনুগ্রহ ও সমৃদ্ধি সমূহ নাযিল হউক। শান্তি বর্ষিত হউক আমাদের উপরে ও আল্লাহর সৎকর্মশীল বান্দাগণের উপরে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল’
১৩. দরূদে ইবরহীম: আল্লা–হুম্মা ছাল্লে ‘আলা মুহাম্মাদিঁউ ওয়া ‘আলা আ–লে মুহাম্মাদিন কামা ছাল্লায়তা ‘আলা ইবরা–হীমা ওয়া ‘আলা আ–লে ইব্রা–হীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। আল্লা–হুম্মা বা–রিক ‘আলা মুহাম্মাদিঁউ ওয়া‘আলা আ–লে মুহাম্মাদিন কামা বা–রক্তা ‘আলা ইব্রা–হীমা ওয়া ‘আলা আ–লে ইব্রা–হীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ ।
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনি রহমত বর্ষণ করুন মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদের পরিবারের উপরে, যেমন আপনি রহমত বর্ষণ করেছেন ইবরাহীম ও ইবরাহীমের পরিবারের উপরে। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও সম্মানিত। হে আল্লাহ! আপনি বরকত নাযিল করুন মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদের পরিবারের উপরে, যেমন আপনি বরকত নাযিল করেছেন ইবরাহীম ও ইবরাহীমের পরিবারের উপরে। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও সম্মানিত’।
১৪. দু’আ মাসূরা: আল্লা–হুম্মা ইন্নী যালামতু নাফ্সী যুলমান কাছীরাঁও অলা ইয়াগ্ফিরুয যুনূবা ইল্লা আন্তা,ফাগ্ফিরলী মাগফিরাতাম মিন ‘ইনদিকা ওয়ারহাম্নী ইন্নাকা আন্তাল গাফূরুর রহীম’ ।
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আমার নফসের উপরে অসংখ্য যুলুম করেছি। ঐসব গুনাহ মাফ করার কেউ নেই আপনি ব্যতীত। অতএব আপনি আমাকে আপনার পক্ষ হ’তে বিশেষভাবে ক্ষমা করুন এবং আমার উপরে অনুগ্রহ করুন। নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল ও দয়াবান’।
১৫. সর্বশেষে, প্রথমে ডানে ও পরে বামে ‘আসসালামু আলায়কুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ’ (আল্লাহর পক্ষ হ’তে আপনার উপর শান্তি ও অনুগ্রহ বর্ষিত হোক) বলে সালাম ফিরাবে।
নামাযের শ্রেনী–বিভাগ
ফরয
সকালে ২ রাকাত ফরয নামায আছে। ফরয নামায অবশ্যই পড়তে হবে। না পড়লে গুনাহ হবে। ফরয নামায ২ বার পড়া যায়।
ওয়াজিব
দুই ঈদের নামায হচ্ছে ওয়াযিব। ইচ্ছাকৃত ও নিয়মিত না পড়লে গুনাহ হবে।
সুন্নত
সুন্নতে মুয়াক্কাদা ও সুন্নতে
বিতির
বিতর মূলত: সারাদিনেরনামাযের পরিসমাপ্তি। সেদিক থেকে এটা গুরুত্বপূর্ন। বিতর নামায ২ বার পড়া যায় না।
নফল
পড়লে সোয়াব হবে।তবে হাশরের মাঠে যদি ফরয নামায প্রয়োজনের থেকে কম থাকে, তাহলে মহান আল্লাহ ফরযের পরে ওয়াযিব,নফল ইত্যাদি থেকে নিয়ে সেই মানুষকে উদ্ধারের চেষ্টা করবেন। কাজেই আপাত দৃষ্টিতে এটা খুব একটা জরুরী মনে না হলেও আসলে অত্যন্ত জরুরী। এই নফল নামাজই মানুষের জন্য বেহেশত-দোযখের সিদ্ধান্তকারী হয়ে যেতে পারে।
অন্যান্য সালাত
তারাবী
সাধারন নফল নামাযের মত দুই দুই রাকাত করে, পড়তে হয়।আমাদের দেশের মসজিদগুলোতে ২০ রাকাত তারাবী পড়ানো হয়।
দুই ঈদের নামায
৬ তকবীরের সাথে দুই ঈদের সালাত পড়ানো হয়।
তাহাজ্জুদ
সাধারন নফল নামাজের ম দুই দুই রাকাত করে মোট ১২ রাকাত , ফজর নামাজের আগে পড়তে হয়।
| নামাযের বাহিরের ( আহকাম) ফরয = ৭ টি
১। শরীর পাক ২। কাপড় পাক ৩। জায়গা পাক ৪। ছতর ঢাকা ৫। ক্কিবলামুখী হওয়া। ৬। ওয়াক্তমত নামায পড়া। ৭। নিয়ত করা (অন্ততঃ মনে মনে) |
নামাযের ভিতরে (আরকান)= ৬ টি
১। তাকবীর ও তাহরীমা ২।দাঁড়িয়ে নামায পড়া ৩।কিরায়াত পড়া ৪। রুকু করা ৫। সিজদাহ করা ৬। শেষ সালামের মাধ্যমে নামায ভংগ করা। |
| নামাযের ১৪ টি ওয়াজিব
১। সূরা ফাতেহা পাঠ করে ( আলহামদু শরীফ) ২। সূরা ফাতেহার সাথে অন্য সূরা বা কিরায়াত পড়া ৩। রুকু-সিজদাহ-কিরায়াতের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা ৪। দুই সিজদাহর মাঝখানে সোজা হয়ে বসা ৫। সালাতের রুকন সঠিক ভাবে আদায় করা। ৬।রুকু করার পর সোজা হয়ে দাঁড়ানো ৭। চার রাকায়াতের নামাযে দুই রাকায়াতের পর তাশাহুদ এর জন্য বসা ৮। তাশাহুদ পড়া ৯। উচ্চস্বরে বা চুপেচুপে কিরায়াত পড়া। ১০। বিতরের নামাযে দোয়া কুনুত পাঠ করা ১১। তেলাওয়াতে সেজদাহ করা ১২। সিজদাহর মাধ্যমে উভয় হাত ও হাটু মাটিতে রাখা ১৩।দুই ঈদে অতিরিক্ত ৬ তাকবীর বলা ১৪।সালামের মাধ্যমে নামায শেষ করা ওয়াজিব না মানলে নামায হবে না। |
|